চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা, কোথায় উজল এমন ধারা।
কোথায় এমন খেলে তড়িৎ এমন কালো মেঘে!
তার পাখির ডাকে ঘুমিয়ে উঠি, পাখির ডাকে জেগে;
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
ও সে সকল দেশের রানি সে যে – আমার জন্মভূমি।
সে যে – আমার জন্মভূমি, সে যে – আমার জন্মভূমি।
এত স্নিগ্ধ নদী কাহার, কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়!
কোথায় এমন হরিৎক্ষেত্র আকাশতলে মিশে!
এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে!
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
ও সে সকল দেশের রানি সে যে – আমার জন্মভূমি।
সে যে – আমার জন্মভূমি, সে যে – আমার জন্মভূমি।
পুষ্পে পুষ্পে ভরা শাখী; কুঞ্জে কুঞ্জে গাহে পাখি;
গুঞ্জরিয়া আসে অলি পুঞ্জে পুঞ্জে ধেয়ে –
তারা, ফুলের উপর ঘুমিয়ে পড়ে ফুলের মধু খেয়ে;
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
ও সে সকল দেশের রানি সে যে – আমার জন্মভূমি।
সে যে – আমার জন্মভূমি, সে যে – আমার জন্মভূমি।
ভায়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ!
– ও মা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি,
আমার এই দেশেতে জন্ম – যেন এই দেশেতে মরি।।
নিম্নের বিষয়টি শুনতে পারবেন।
ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
পড়ার চেয়ে যারা শুনতে পছন্দ করেন, তাঁরা এখানে বিষয়টি শুনতে পারবেন।
অনলাইন বা সফট কপি পড়তে অভ্যস্ত নন, তাঁরা ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
খন্দকার মুস্তাক বা কোনো রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য (মেজর জিয়াউর রহমান,মতিউর রহমান নিজামী, আলী হাসান মুজাহিদ, আবদুল্লাহিল আমান আযমী) বা জাতি-দেশ কেন্দ্রিক বা কোনো ধর্ম কেন্দ্রিক ইচ্ছার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নয়। কেবল জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লবে রূপান্তর করতে এবং দেশের সর্বমহলকে শিহরীত করতে পারে, একত্র করতে এমন জাতীয় সংগীতের লক্ষ্যে “ধন - ধান্য পুষ্প ভরা” গানটি কিছু অংশ অনুমতি সাপেক্ষে জাতীয় সংগীতে রূপান্তর করা হবে।
সামঞ্জস্যতা ও উদ্দেশ্য পরিষ্কার,
|
শ্রেণী |
আমার
সোনার বাংলা |
ধন-ধান্য পুষ্প ভরা |
|
রচিয়তা |
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় |
|
ধর্ম |
সনাতন ধর্ম |
সনাতন ধর্ম |
|
পটভূমি |
বঙ্গভঙ্গ |
বঙ্গভঙ্গ |
|
সমসুরের গান |
“আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে” |
নেই |
|
ভাব |
গম্ভীর |
মায়াবী |
আমার ভালো লাগতো যদি বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্য কোনো গান ছাত্র-জনতার স্প্রিডের সাথে যেত!
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বর্তমান জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়েছে এমন কোনো নজির আমি পাইনি। শিক্ষক, আইনজীবী, শিল্পী সহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষ যারা সরাসরি আন্দোলনে যুক্ত হয়ে কুণ্ঠিত আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করেছে তারাও বর্তমান জাতীয় সংগীতকে উদ্দীপনা বা ঐক্যের ধারক হিসাবে উপস্থাপন করেননি। ছাত্র-জনতার সাহস ও প্রেরণা প্রদানে, আবেগ ও জাতীয় ঐক্যের আহবানে বর্তমান জাতীয় সংগীতকে কেউ সামনে আনেনি, পক্ষে-বিপক্ষের কেউ সামনে আনেনি। এমনকি মিডিয়াতে প্রতিবাদ বা জাতীয় ঐক্যে আহবানের ব্যাকগ্রাউন্ডেও রাখিনি। জাতির এত বড় ঐক্যে জাতীয় সংগীতের ভূমিকা নেই পৃথিবীতে এটি বিরল। কাজেই বর্তমান জাতীয় সংগীত তরুণ প্রজন্মের আবেগের কেন্দ্রীয় বিন্দুতে বা শিহরণে পৌঁছাতে পারেনি।
বরং জুলাই বিপ্লবে প্রতিটি
জেলা-থানায়, দেশের যেখানেই আন্দোলন হয়েছে মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে,পতাকা গায়ে জড়িয়ে বিক্ষোভ সমাবেশে অবরোধে স্লোগানের পাশাপাশি
ছাত্র-জনতাকে উজ্জীবিত করতে, একত্রিত করতে তাদের মনোবল
বৃদ্ধি করতে সম্মিলিত কন্ঠে “ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই
বসুন্ধরা” গানটি গাইতে শোনা গেছে। অন্যান্য গানও গাইতে শোনা
গেছে তবে কোথাও বর্তমান জাতীয় সংগীত গাইতে শুনিনি, আমি
খুঁজে পাইনি। এমনকি মাদ্রাসার ছাত্ররাও “ধনধান্য পুষ্প ভরা
আমাদের এই বসুন্ধরা” গানটিকে বাদ্যযন্ত্র ছাড়া সুমধুর কন্ঠে
গজল হিসেবে পরিবেশন করে মাদ্রাসা ছাত্রদেরও উজ্জীবিত করেছে, একত্রিত
করেছে। এই গানটি ছাত্র-জনতার সম্মিলিত কন্ঠে সবাইকে শিহরিত করেছে, আপ্লুত করেছে। আমার পরিচিতদের মধ্যে শুনেছি সম্মিলিত কন্ঠে গানটি শুনে
অনেক পাষাণ হৃদয়ও নরম হয়েছিল।
তৎকালীন সঙ্গীতজ্ঞ এবং বিশেষজ্ঞরা
মনে করেন, যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃক রবীন্দ্রনাথ চর্চার নিষিদ্ধ ছিল
সেহেতু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যেকোনো প্রতিবাদে পূর্বে বর্তমান জাতীয় সংগীত গাওয়া
হতো। বিভিন্ন আন্দোলনে গাইতে গাইতে মূলত এই গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হয়ে
উঠেছে, আবেগ সৃষ্টি করতে পারেনি। কাজেই কেবল শিল্পীরা ব্যতীত সর্বমহলে গানটি
আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেনি।
“ধনধান্য
পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা” গানটি আমাকে যেভাবে আন্দোলনে
পুনর্জীবিত করেছে, উদ্বুদ্ধ করেছে,
Ø
৫ জুলাই থেকে আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণের ইচ্ছা থাকলেও ঢাকা
শহরের যানজট নিরসনে গণপরিবহন কেন্দ্রিক আমার দীর্ঘদিনের (২ বছর যাবত) একটি গবেষণা “স্মার্ট
ট্রাফিক, স্মার্ট সিটি” বাস্তবায়নের
লক্ষ্যে সাহস করে বন্ধুদের সাথে অংশগ্রহণ করতে পারিনি।
Ø
১৬ তারিখ রাতে মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদ আবু সাঈদের মৃত্যুর পর
সুমি আপার কথা শুনে প্রোজেক্টের দোহাই দিয়ে নিজেকে আটকে রাখতে পারেনি। তামিরুল মিল্লাতের
ছোট ভাই এবং ঢাবির রুমমেটের সাথে ১৭ তারিখ গায়েবী জানাজায় অংশগ্রহণ করে ফেরার পথে
দুরবৃত্তিরা শখের সাইকেলের সামনের মাডগার্ড ভেঙে ফেলে এবং সাইকেল সহ লাথি মেরে
ফেলে দেয়। ক্ষোভে রাতেই যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনে গিয়ে আমার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ
শুরু ।
Ø
যাত্রাবাড়ীতে বাসায় বাসায় তল্লাশি, পুলিশের রেটের ভয়ে ২৪
তারিখ রাতে সবাই চলে যায়, আমার নিজের ছোট ভাইকেও বাড়িতে পাঠিয়ে দেই,
আমি ঢাকায় থেকে যাই। ঝিমিয়ে পড়া আন্দোলনে হতাশা থেকে আর যোগ দিব
না ভেবেছিলাম কিন্তু শিক্ষক, আইনজীবী ও শিল্পীদের অংশগ্রহণ
আন্দোলনটি পুনরায় দানা বাঁধতে শুরু করলেও সরকারের সহযোগিতায় গবেষণা ইমপ্লিমেন্টের
লক্ষ্যে নতুন করে আন্দোলনে যোগ দিতে সাহস পাচ্ছিলাম না।
Ø
৩ আগস্ট ছাত্র-জনতার জনসমুদ্রের সম্মিলিত কন্ঠে “ধন
ধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা” গান শুনে চোখ জুড়ে
জল থৈথৈ, চোখের কোনা বেয়ে জল পড়ে, গায়ের
লোম দাঁড়িয়ে যায়, আমাকে শিহরিত করে, সকল স্বার্থপরতা, সকল বাঁধন যেন তুচ্ছ হয়ে পড়ে,
কিছুক্ষণের মধ্যে বেরিয়ে পরি।
Ø
৪ আগস্ট পুলিশের রাবার বুলেট খেয়ে দৌড়ানোর সময় দেশি
অস্ত্রসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগরা তিন-চার হাতের মধ্যে চলে আসলেও কিভাবে বেঁচে গেছি
একমাত্র সৃষ্টিকর্তা জানে, অস্ত্র ছুড়ে মারলেও শেষ হয়ে যেতাম। দৌড়ে
কেচি গেটে তালা দিয়ে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে পাঁচতলায় (বাসায়) উঠতে থাকি,
পিছন পিছন তারাও এসে কিছুক্ষণ গেট ধাকিয়ে বাড়ির মালিকসহ যাচ্ছেতাই
গালাগালি দিতে থাকে, গেট না খুললে গুলি করার হুমকি দিয়ে
কিছুক্ষণ হুমরিতামরি করে, বাহির হলে খবর আছে বলে চলে যায়। আতঙ্কিত হয়ে নিচতলা
থেকে আপা (খাবার নেই) এসে বলে “আপনাকে খাবার দিতে পারবো না
বাড়ি চলে যান”। ১০ মিনিটের মধ্যে বাড়িওয়ালা বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলে।
রাতে ফ্লাটে তালা দিয়ে ছাদে থেকে ভোর ৪টার দিকে সাইকেলটি সিঁড়ি থেকে ফ্ল্যাটে
ঢুকিয়ে এক কাপড়ে বাসা থেকে বেরিয়ে চলে যায়।
সেদিন রাতে হয়তো ৫০ বারের বেশি সম্মিলিত
কন্ঠে ঐ গানটি আমি শুনেছি, আমাকে সাহস যুগিয়েছে, আমাকে দুর্বল হতে দেয়নি। ফলে সেদিন
বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন কাউকে জানায়নি। এমনিতে বাবা টেনশন করেন,
১৭ জুলাই থেকে আসরের নামাজ পড়ে মাগরিব পর্যন্ত তিনি মসজিদ থেকে বের
হতে না দোয়া করেতেন, ৪ আগস্ট পর্যন্ত একটানা এই আমল করেছেন।
তার জন্য হয়তো সৃষ্টিকর্তা মৃত্যুর দুয়ার থেকে সেদিন আমাকে বাচিয়ে দিয়েছিল।
বর্তমান জাতীয় সংগীতের বর্ণাঢ্য ইতিহাস,
রবীন্দ্র সংগীত
চর্চা নিষিদ্ধের প্রতিবাদে ভাষা শহীদদের স্মরণে ১৯৫৩ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি
আয়োজিত অনুষ্ঠানে বর্তমান জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়েছিল, ১৯৫৩-৫৪
সালে ডাকসুর অভিষেক অনুষ্ঠানে, ১৯৫৬ সালের কার্জন হলে পশ্চিম
পাকিস্তানের সংসদদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহত্ব তুলে ধরতে শেখ মুজিবুর
রহমানের নির্দেশে গানটি শোনানো হয় এবং বিভিন্ন পাকিস্তানি বিরোধী প্রতিবাদ
অনুষ্ঠান বা সমাবেশে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বর্তমান জাতীয় সংগীতটি পরিবেশন
করা হতো। বারবার উপস্থাপনের ফলে ততদিন মানুষ গানটি ধারণ করেছিল। এজন্য ১৯৭১ সালে ৩
মার্চ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ইশতেহারে গানটি জাতীয় সংগীত হিসেবে ঘোষণা
করে, ৭ই মার্চ ভাষণের আগে এবং মুক্তিযোদ্ধা চলাকালে মানুষদের
অনুপ্রাণিত করতে গানটি বেতার কেন্দ্র থেকে প্রতিনিয়ত প্রচার করা হতো। ১৯৭২ সালের
১৩ জানুয়ারি প্রথম দশ লাইন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে
আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। দেশের জন্মলগ্ন থেকে জাতীয় সংগীত থাকায় জাতীয় পর্যায়ে
কিছু স্বীকৃতিও আছে।
বর্তমান জাতীয়
সংগীত বাংলাদেশীদের আবেগ তাড়িত করে পারেনি। শত্রু শত্রু আমার বন্ধু সেই হিসাবে
গৃহীত হয়েছে। দেশবাসীর চাপে বিভিন্ন সময় বর্তমান জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের চেষ্টা
করা হলেও জনমানুষের আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে ব্যক্তি বা দলের স্বার্থকে প্রাধান্য
দেওয়ায় বর্তমান জাতীয় সংগীত পরিবর্তন সম্ভব হয়নি।
“ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা”
গানটির বৈশিষ্ট্য,
গানটির মূল থিম
হলো দেশের সৌন্দর্য, ঐক্য, ত্যাগীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং
দেশপ্রেম। গানে পুষ্প, ধন-ধান্যের কথা উল্লেখ করে দেশকে
ক্লান্তিহীনভাবে ভালোবেসে যাওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
গানটি বাংলাদেশের
সমৃদ্ধ প্রকৃতি, কৃষি, ও মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে এবং
সংস্কৃতি ও ঐক্যের ধারক। গানটির মূল সুর ও সঙ্গীত সাধারণত অনুপ্রেরণামূলক এবং এটি
সমাজের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক
সৌন্দর্যকে তুলে ধরে, একত্রে বাঙালিরা যে কীভাবে প্রকৃতির
সাথে মিলেমিশে জীবনযাপন করে, সেটি তুলে ধরা হয়েছে। এটি
দেশের প্রতি গভীর প্রেম এবং শ্রদ্ধাবোধের অভিব্যক্তি। গানটি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে,
বিশেষ করে জাতীয় উৎসব এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গাওয়া হয় এবং এটি
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এছাড়াও, এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে জাতীয় ভাবাদর্শ এবং সংহতির প্রতীক হিসেবে কাজ করে। গানটি সমাজের প্রতি মানুষের জন্য প্রেরণা ও আবেগের সূতিকাগার।